মো. নমশের আলম।।
শীতকালীন সবজি উৎপাদনে শেরপুর জেলার প্রচুর সুখ্যাতি রয়েছে। এখানে উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে বছরজুড়ে। শীত কিংবা বর্ষা, সব ঋতুতেই শেরপুরে প্রচুর শাকসবজির চাষাবাদ হয়ে থাকে। চলতি রবি মৌসুমেও শেরপুরে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে নানা ধরনের শীতকালীন সবজির আবাদ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে জৈব প্রযুক্তিতে করা হয়েছে প্রচুর টমেটো চাষ। জেলায় টমেটোর আবাদ করা হয়েছে ৬ শত ১৪ হেক্টর জমিতে। আগাম উৎপাদিত টমেটোর ভাল দাম পেয়ে চাষিদের লাভও হয়েছে ভালো। কিন্তু এখন বাজারে দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া খুবই অনুকূলে থাকায় অন্যান্য সবজির মতো টমেটোর ফলনও ভালো হয়েছে। এখন প্রতিমন টমেটো পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩ শত টাকায়। ফলে বাম্পার ফলন পেয়েও হাসি নেই চাষিদের মুখে। টমেটো ক্ষেতে ভালো ফলন দেখে লাভের স্বপ্ন বুনতে থাকা চাষিদের মাঝে এখন দেখা দিয়েছে চরম হতাশা।
খবরের ভিডিও লিংক
https://youtu.be/f_QHECdVKco?si=8vFYWKs5cU-E0NM7
https://www.facebook.com/share/v/1BAFVnfQMH/
শেরপুরের সদর উপজেলার চরাঞ্চলের মাটি সবজি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তাই এখানে সবজির আবাদ হয় সবচেয়ে বেশি। চলতি মৌসুমে জেলায় ৬ শত ১৪ হেক্টরের মধ্যে সদর উপজেলাতেই আবাদ হয়েছে ৪ শত ৫০ হেক্টরে। সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে বেতমারি ঘুগরাকান্দী ইউনিয়নের গিয়ে দেখা গেছে কৃষকরা তাদের ফসলের নানা পরিচর্যায় ব্যস্ত। কেউ কেউ পাকা টমেটো তুলছেন বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাবেন বলে। কিন্তু তাদের কারো মুখেই হাসি নেই।
এই ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদ আনোয়ার জানান বেতমারি ঘুগরাকান্দী ইউনিয়নে
সত্তর হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কারিগরি সহায়তাসহ সার্বক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে কৃষি বিভাগ থেকে। বর্তমানে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু ফলন ভালো হয়েছে, তাই বর্তমান বাজার মূল্য বজায় থাকলে কৃষকরা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন।
ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে ঘুগড়াকান্দী বাজারের পাশে এক টমেটো চাষি হাফিজুর রহমান তার ক্ষেতের পরিচর্যা করছিলেন। তাকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, ‘এসব এলাকায় বিউটিফুল, বিউটিফুল প্লাস এবং রাজকুমার জাতের টমেটো আবাদ করা হয়েছে। তন্মধ্যে বিউটিফুল প্লাস বেশি জনপ্রিয়। কারণ এর ফলন বেশি এবং পঁচেনা। জৈব প্রক্রিয়ায় বিষমুক্ত নিরাপদ টমেটো উৎপাদনে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে চাষিদের কারিগরি সহযোগিতা এবং পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।”
কৃষক হাফিজুর রহমান জানালেন, তিনি এক বিঘা জমিতে বিউটিফুল জাতের টমেটোর আবাদ করেছেন। ফলন খুবই ভালো হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
বেতমারি খাসপাড়া এলাকার এক টমেটো চাষি মো. সোলায়মান হুসেন বলেন, দেড় বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদ করেছি। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন টমেটোর দাম কমে যাওয়ায় বেপারীরাও আসছেন না। গত বছরও টমেটোর আবাদ করে খুব ভালো লাভ পেয়েছিলাম। এখন যে অবস্থা তাতে খরচও উঠবে না। এখন আমরা কীভাবে চলবো তাই নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’
এখানকার আরেক টমেটো চাষি মো. আব্দুল খালেক জানান, টমেটো চাষে তাদের খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বাজারে দাম কমে যাওয়ায় খরচও উঠাতে পারছেন না। বাজারে ব্যাপারীর টমেটো নিচ্ছেন না। এজন্য খুবই চিন্তিত রয়েছেন তারা।
পাশেই নিজের ক্ষেতের পাকা টমেটো তুলছিলেন কৃষক মো. বরকত আলী। তিনি বলেন, ‘ এক বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদ করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন টমেটো বিক্রি করতে পারতেছি না। ৩০০ টাকা মন দরে টমেটো বিক্রি করে খরচও উঠবে না। আমরা কৃষক মানুষ, এর উপরেই আমাদের জীবিকা। এখন কীভাবে চলবো!
আরেক চাষি মো. উবায়দুল হক বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদ করেছি। প্রথমবার চারা লাগানোর পর বন্যায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আবার লাগিয়েছি। তাই আগাম ফসল উঠাতে পারি নাই। এখন মাত্র পাকা শুরু হয়েছে কিন্তু বাজারে খাচ্ছে না। কীভাবে চলবো তাই নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।’
কথা হয় বেতমারী গ্রামের টমেটো চাষি এমরান মিয়া, জয় হোসেন, আকলিমা বেগম সহ আরও কজন কৃষকের সাথে। তারাও জানালেন, আগে দাম ভালই ছিল। তাই তারা ভালো ফলন দেখে লাভের আশা করছিলেন। কিন্তু এখন সবাই আশাহত হয়ে লোকসানের আশঙ্কায় ভুগছেন।
শেরপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘টমেটো একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন সবজি। এ বছর শেরপুরে ৬১৪ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে। তন্মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলায় আবাদ হয়েছে ৪৫০ হেক্টরে।টমেটো চাষে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত টমেটো চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা করছি এবং কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা সহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে শেরপুরের টমেটো যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের অন্যান্য জেলাতে।’
শেরপুরে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পুরাণে ভূমিকা রাখছে। উৎপাদনের এই লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে হল কৃষকরা যেন লাভ থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনে সরকারি প্রণোদনা সহ কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধির করতে হবে। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








