মো. নমশের আলম :
মৌ চাষ লাভজনক হওয়ায় শেরপুরে বৃদ্ধি পেয়েছে এর জনপ্রিয়। দিন দিন বেড়েই চলেছে মৌ খামারির সংখ্যা। ফলে এই সেক্টরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় প্রায় ৪০-৫০ টি বাণিজ্যিক মৌচাষের খামার গড়ে উঠেছে। এছাড়াও ২-৩ টি বাক্সে মৌমাছি পালন করে বাড়তি উপার্জন করছেন কয়েকশ পরিবার। কৃষি বিভাগ বলছে, সরিষা ক্ষেতে মৌ বক্স স্থাপন একটি সফল প্রযুক্তি। বেকার যুবকদের মৌ বক্স স্থাপনের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি সরিষার উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে আমরা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী খাঁটি মধু পাচ্ছি।
উল্লেখ্য, শেরপুরের ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গারো পাহাড়ে নানা জাতের পাহাড়ি বৃক্ষ সারা বছর ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে। এছাড়া সীমান্তের ভারতীয় অঞ্চলে রয়েছে প্রচুর ফুল ও ফলের বাগান। আবার শীতকালে জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়ে থাকে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই অনেকে বাক্সে মৌচাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিচ্ছে। মৌ চাষে প্রচুর লাভ হওয়ায় দিন দিন স্থানীয় মৌচাষীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার মধু আহরণ করতে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে শেরপুরে ছোটে আসছে মৌ খামারিরা। মূলত, উন্নত জাতের মেলিফেরা ও সিরেনা- এই দু’টি জাতের মৌমাছি দিয়ে এখানকার চাষিরা মধু সংগ্রহ করছেন।
খবরটির ভিডিও প্রতিবেদন দেখতে ক্লিক করুন
https://youtube.com/playlist?list=PL-Wgn_fuuAhtpCwxLn-SJZppOdX2ICh51&si=ED_N4bBQpUbDL5cB
জেলার কৃষি বিভাগের তথ্যমতে ক্যাপ ছাড়া মধু তাপের সাহায্যে পিউরিফাই করতে হয়। এরপর মধু ক্যাপ করে সংরক্ষণ করলে তাতে সহজে ফাঙ্গাস ও দুর্গন্ধ হয়না। তাই ক্যাপকৃত মধুর বাজারমূল্যও বেশী পাওয়া যায়। শেরপুরের গারো পাহাড়ে উৎপাদিত মধুর প্রায় পুরোটাই ক্যাপকৃত এবং এর গুণগত মানও অতুলনীয়। তাই বাজারে এই মধুর চাহিদা বেশি।
মৌ চাষীরা জানায়, মধ্য নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে সরিষা ক্ষেতে, ফেব্রুয়ারিতে কালিজিরা ও ধনিয়া ক্ষেতে, মার্চের শুরু থেকে লিচু বাগানে এবং এপ্রিল মাস থেকে গারো পাহাড়ে বনের ফুলের মধু আহরণ করেন তারা। তাই তাদেরকে মধু আহরণ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। এখন চলছে সরিষা ফুলের মধু আহরণের মৌসুম। তাই মধু আহরণের জন্য মৌ খামারিরা এখন শেরপুরের চরাঞ্চলের সরিষা ক্ষেতে মৌ বক্স বসিয়েছেন।
শেরপুরের সরিষা ক্ষেতে মৌ চাষের সরেজমিন চিত্র দেখতে সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের ভাতশালা গ্রামে ও নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চন্দ্রকোনা বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে সরিষা ক্ষেত হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে। চারিদিকে সরিষা ফুলের মৌ মৌ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। সমস্ত প্রকৃতি যেন গায়ে হলুদ চাদর জড়িয়েছে। ফুলে ফুলে গুনগুন করছে মৌমাছি। মাঠের পাশেই এক টুকরো খালি জায়গায় তাঁবু গেড়েছেন ভ্রাম্যমাণ মৌ চাষিরা। আর তাঁবুর পাশেই মৌমাছির বাক্স স্থাপন করে পুষ্টিগুণে ভরপুর খাঁটি মধু আহরণ করছেন তারা।
নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা বাজারের কাছেই বিস্তীর্ণ মাঠের সরিষা ক্ষেতের একপাশে তাঁবু খাটিয়ে বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করছিল দুজন শিক্ষিত যুবক। তারা হলেন নকলা উপজেলার সাউদা মোস্তফা মো. সৌমিক ও সদর উপজেলার আল জিয়াদ। তারা শুনালেন পড়াশোনা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে মৌ চাষের মাধ্যমে তাদের সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প।
সাউদা মোস্তফা মো. সৌমিক একজন সমন্বিত কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে উঠার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে জানায়, ‘২০২০ সালে অর্থনীতিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকুরির পিছনে না ঘুরে নিজেই কিছু করার চেষ্টা শুরু করি। শুরুটা করি মৌ চাষের মাধ্যমে। প্রথমে আমি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন গাজিপুর থেকে মৌমাছি পালনের উপর ৫ দিনের প্রশিক্ষণ নেই। তারপর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন খামারে ঘুরে ঘুরে কাজ শিখেছি। আমার এই মৌ খামারে ১৫০টি বাক্স রয়েছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার মধু বিক্রি হয়। সব খরচ বাদে আমার বছরে ১২ লাখ টাকার মতো লাভ থাকে। আমাদের উপজেলা কৃষি অফিসার আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন মৌমাছি নিয়ে কিছু কাজ করার জন্য।’ তিনি আরও জানালেন, এখন তার একটি গরুর খামার এবং একটি গাছের চারার নার্সারি রয়েছে। পাশাপাশি চার একর জমিতে করছেন কৃষি চাষবাস।
আরেক উদ্যোক্তা সোনার বাংলা মৌ খামারের মালিক সদর উপজেলার আল জিয়াদ বলেন, ‘ আমি ছয় থেকে সাত বছর যাবত ভ্রাম্যমাণ মৌ খামার নিয়ে কাজ করতেছি। ২৫০টি বাক্স নিয়ে এখানে মধু আহরণ করতে এসেছি। প্রতিবছর আমার ২৫০টি বাক্সের পেছনে সাত থেকে আট লক্ষ টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। এখানে প্রতি বাক্স থেকে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ কেজি মধু পাব। এ বছর মধু বাজারজাত করে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা পাব বলে আশা করা যায়।’
সোনার বাংলা মৌ খামারে হাতেনাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা এক যুবক মো. শাহজালাল। শাহজালাল জানায়, তাদের এলাকায় গিয়ে কালি জিরা ক্ষেতে মধু আহরণ করেন মৌ চাষীরা। তাই দেখে মৌচাষে আগ্রহ জাগে তার। এজন্যই অনেকদিন হল সোনার বাংলা মৌ খামারে হাতেনাতে মৌমাছি লালন পালনের কাজ শিখছেন।
সদর উপজেলা ভাতশালা এলাকায় গিয়ে দেখা গেল সরিষা ক্ষেতে বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করতে। এখানে মধু আহরণ করতে এসেছেন সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার সারিকাটা এলাকার এক মৌ খামারি। তিনি বলেন, ‘প্রায় তেত্রিশ বছর ধরে মৌমাছির বাক্স নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করি। শেরপুরের এই এলাকায় প্রচুর সরিষার আবাদ হয়। তাই প্রতিবছরই সরিষার মৌসুমে এখানে এসে মধু সংগ্রহ করি। আমাদের কাছে খাঁটি মধু পেয়ে অনেকেই এখানে এসে মধু সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন।’
স্থানীয় চন্দ্রকোনা এলাকার কৃষক মো. মোস্তফা কামাল, মো. দুদু মিয়া সহ আরো কয়েকজন কৃষক জানান, বাপ দাদার আমল থেকেই সরিষার আবাদ করছেন তারা। মৌ চাষীরা আসার ফলে তারা যেমন ভালো মধু পাচ্ছেন তেমনি সরিষার ফলনও আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। তাই মৌ চাষিরা আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
খামারিরা আরও জানান, গড়ে একশত বাক্স থেকে বছরে ৪-৫ টন মধু সংগ্রহ করা যায়। গ্রেড অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে প্রতিমণ মধু ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পাহাড়ি ফুলের খাঁটি মধু স্বাদে গন্ধে অনন্য এবং দামও বেশি। এতে ১০০টি বাক্সের একটি খামার থেকে বছরে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা লাভ হয়। মধু বিক্রির জন্য তাদের অনলাইন নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে। আবার ভোক্তারা খাঁটি এবং টাটকা মধু পেয়ে অনেকেই এসে সরাসরি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় চন্দ্রকোনা কলেজের প্রভাষক সজীব মিয়া বলেন, ‘বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে এই চন্দ্রকোনা চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সরিষার আবাদ হয়। তাই এই সিজনে মৌয়ালরা এসে মধু সংগ্রহ করেন। মৌমাছির কারণে পরাগায়ন বৃদ্ধির ফলে সরিষার উৎপাদন বেশী হয় এবং এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ এ বছর আমাদের সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার ৭২০ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ১৯ হাজার ৬৮ হেক্টর জমিতে। সরিষা ক্ষেতে মৌবক্স স্থাপন একটি সফল প্রযুক্তি। মৌমাছি পরাগায়নে সহায়তা করে এবং এতে সরিষার ফলন বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে আমরা খাঁটি মধু পাই এবং মধু স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। অনেক বেকার যুবকেরকে আমরা মৌবক্স স্থাপনের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছি। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি সরিষা উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
মৌ চাষী এবং সচেতন মহল বলেছেন, শেরপুরের প্রকৃতিতে মৌ চাষের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মৌ চাষ বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান সহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি এবং মধু প্রকৃয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি মুল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে।








