মোঃ নমশের আলম :
বাংলাদেশে আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। সারা বছরই আমাদের নানা রকমের রান্নার কাজে এবং বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে আলুর ব্যবহার রয়েছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর আলু উৎপাদনে সময় যেমন কম লাগে তেমনি আবার ফলনও হয় ভালো। এ বছর বাজারে ভালো দাম থাকায় শেরপুরে আলুর আবাদ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমন এবং বোরো ধানের আবাদের মধ্যবর্তী সময়ে বাড়তি একটি ফসল হিসেবে আলুচাষ করেন কৃষকরা। আলু চাষে সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো মানের বীজের অভাব। দেশে প্রতি বছরই বীজ আলুর সংকট দেখা দেয়। খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা শেরপুরের কৃষকরা করছেন উন্নত জাতের বীজ আলুর চাষ। আর শেরপুরের বীজ আলুর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে সারাদেশে।

বিএডিসির সরাসরি তত্ত্বাবধানে বীজ আলুর চাষ করে আসছেন শেরপুরের কৃষকরা। শেরপুর জেলার ৫টি উপজেলাতেই আলুর আবাদ হলেও বীজ আলুর চাষ করা হয় শেরপুর সদর ও নকলা উপজেলায়। এখানকার বেলে দোআঁশ মাটি আলু চাষের জন্য বেশি উপযোগী। শেরপুর বিএডিসির তথ্যমতে ওই দুই উপজেলায় এ বছর ৫২০ হেক্টর জমিতে বীজ আলুর চাষ করা হয়েছে।আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ৫ হাজার টন আলু বীজ উৎপাদনের আশা করছে বিএডিসি।
এই খবরের ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন
https://youtu.be/OPUBSNTlYCo?si=wGn6eMLpY0xH0iZj
উল্লেখ্য, ওই দুই উপজেলাতেই রয়েছে বিএডিসির নিজস্ব হিমাগার। বীজ আলুর চাষের জন্য হিমাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করে সরকারিভাবে জমি নির্বাচন করা হয়। এসব নির্বাচিত জমিতেই চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে বীজ আলুর চাষ করা হচ্ছে। এজন্য কৃষকদের আর্থিক ঋণ, উন্নত জাতের বীজ ও সার সরবরাহ এবং বীজ বপন থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সরাসরি মাঠে থেকে সার্বিক তত্ত্বাবধান করে থাকে বিএডিসি হিমাগার কর্তৃপক্ষ। ফলে বীজ আলু চাষীদের তেমন নগদ টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না। লোকসানের ঝুঁকি একেবারেই নেই, সময় এবং খরচের তুলনায় লাভ বেশী, তাই বীজ আলু চাষে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে শেরপুরের কৃষকদের মধ্যে।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছর শেরপুর জেলায় আলু চাষের মোট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ২১২ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ২৯৬ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৮৪ হেক্টর বেশি। বিএডিসির মাধ্যমে উন্নত জাতের ভালো মানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষকের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া সহ সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। এছাড়াও শেরপুর সদর উপজেলা এবং নকলা উপজেলায় বিএডিসির মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ আলুর চাষ করা হচ্ছে। এজন্য বিএডিসি কৃষকদের মাঝে ভালো মানের বীজ ও সার সরবরাহ সহ আর্থিক ঋণ দিচ্ছে। ফলে স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে আমন ও বোরো ধানের আবাদের মধ্যবর্তী সময়ে বাড়তি লাভজনক ফসল বীজ আলুর চাষ করে লাভবান হচ্ছে শেরপুরের কৃষকরা।
সরেজমিনে শেরপুর সদর উপজেলার চরাঞ্চলের লছমনপুর, বলায়েরচর, চর পক্ষীমারি ইউনিয়নে এবং নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তির্ণ মাঠ জুড়ে আলুচাষ করা হয়েছে। কৃষকরা সবাই আলু ক্ষেতের পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কেউ ক্ষেতে পানি সেচ দিচ্ছেন, কেউ সার দিচ্ছেন, কেউ কেউ কোদাল টেনে গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন, আবার কেউবা ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন। গত ক’দিন যাবৎ কুয়াশা বেশি থাকলেও তথ্যসেবা নিয়ে কৃষকদের পাশে রয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ। বিএডিসির প্রশিক্ষিত কর্মীদের দেখা যায় আলুক্ষেতে ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করে ভাইরাস আক্রান্ত গাছ অপসারণ করতে।
চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বাছুর আলগা দক্ষিণপাড়ার মোঃ রুপচান মিয়া, মোঃ আনোয়ার হোসেন সহ কয়েকজন কৃষি শ্রমিক জানায়, তারা আলু বীজ রুপন থেকে শুরু করে ফসল উঠানো পর্যন্ত একর প্রতি চুক্তি ভিত্তিক পরিচর্যা কাজ করে থাকে। এতে তাদের গড়ে দৈনিক আয় হয় ৭ শত থেকে ৮ শত টাকা। আলু ক্ষেতে কাজ করে ভাল আয়ের একটা উৎস পেয়ে বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
চন্দ্রকোনা এলাকার আলুচাষি মোঃ মহর উদ্দিন জানালেন, গত ৭ বছর যাবত তিনি বীজ আলু চাষ করে আসছেন। এ বছরও ৬৬ বিঘা জমিতে বীজ আলুর চাষ করেছেন। চন্দ্রকোনা বিএডিসি হিমাগারের উপ পরিচালক শহীদুল ইসলাম তার ক্ষেতে সার্বক্ষণিক তদারকি করে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আবহাওয়া এই অনুকূল অবস্থা বজায় থাকলে ২০ লাখ থেকে ২২ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
কৃষক মহর উদ্দিন সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নের ইসমাইল হোসেন সহ কয়েকজন চাষী জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে বীজ আলুর চাষে একরপ্রতি ১২ টনের উপরে ফলন পাওয়া যায়। বীজ আলু চাষের জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় বীজ ও সার কিটনাশক সহ বিঘাপ্রতি ২২ হাজা টাকা করে ঋণ দিচ্ছে বিএডিসি। বিএডিসির উপপরিচালক সবসময় সব রকমের সহযোগিতা করছেন। আবহাওয়া ভালো থাকায় বাম্পার ফলন আশা করছেন তারা। উৎপাদিত আলু বিএডিসিই কিনে নেয় এবং প্রাপ্য মূল্য থেকে ঋনের টাকা কেটে নেয়া হয় বলে জানান তারা।
শেরপুর শেরীঘাট বিএডিসি হিমাগারের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘ বিএডিসি বীজ আলু উৎপাদন জুন শেরপুর ও নকলায় চাষকৃত ৫২০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার মেট্রিকটন। অনুকূল আবহাওয়া যদি বিরাজ করে তবে উৎপাদন ৫ হাজার মেট্রিকটন ছাড়িয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ নিবিরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নকলা এবং শেরপুরকে আমরা ১০ টি সিড উৎপাদন ভিলেজ করেছি। উৎপাদিত আলু শেরপুরে জন্য রেখে বাকিটা মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, মৌলভীবাজার জেলাসহ ১০ টি জেলায় সংরক্ষণের জন্য আমরা পাঠাই। ‘
শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি এর উপ পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা এ বছর ৫ হাজার ২৯৬ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে চাষিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি বিএডিসির মাধ্যমে ভালো মানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। এতে কাঙ্খিত ফলন মিলছে এবং প্রতিবছরই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শেরপুরের আলু বীজের মান ভালো হওয়ায় সারাদেশই এর চাহিদা বেশি। এখানকার কৃষকরা বীজ আলুর চাষ করে খুবই লাভবান হচ্ছে।’

বিএডিসির শেরপুর হিমাগারের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে এক হাজার মেট্রিকটন আর নকলা হিমাগারের দুই হাজার মেট্রিকটন। দেশে প্রতিবছরই আলু বীজের সংকট দেখা দেয়। তাই উৎপাদন বাড়াতে শেরপুরে নতুন করে আরও বিএডিসির হিমাগার স্থাপন এবং চাষের আওতা বৃদ্ধি করা হলে আলু বীজের সংকট যেমন কমে আসবে তেমনি কৃষকরাও লাভবান হবে। এমনটাই মনে করছেন আলু চাষিরা এবং স্থানীয় সচেতন মহল।








